(৩০ মে ২০১২) সরকারিভাবে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সাগরস্নাত ফেনীর সোনাগাজীর উপকুলীয় এলাকায় চলছে সাদা সোনা বলে খ্যাত চিংড়ি পোনা আহরণের মহোৎসব। প্রতি বছর জানুয়ারি-জুন মাস পর্যন্ত চলে পোনা আহরণের এ উৎসব। ফেনী নদীর মুহুরী সেচ প্রকল্প এলাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের মীরসরাই এর ইছাখালী, বানচন্দ খাল পর্যন্ত এবং ছোট ফেনী নদীর কাজীরহাট স্লুইজ গেইট থেকে দক্ষিণে সন্দ্বীপ চ্যানেল পর্যন্ত বিশাল উপকূলীয় এলাকায় প্রতিদিনই লক্ষ লক্ষ চিংড়ি পোনা আহরণ করা হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ শুধু নদীতে চিংড়ি পোনা আহরণ করেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে। দিনরাত পালাক্রমে এখানকার ৮-১০ বছরের শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ চিংড়ি পোন আহরণ করছে। পোনা আহরণকারী লোকজন নদী ও খালের মুখে মশারির জাল ব্যবহার করে গলদা ও বাগদা চিংড়ি পোনা আহরণ করে স্থানীয় মহাজন বা আড়ৎ দারদের কাছে বিক্রি করে। চিংড়ি পোনা ধরতে গিয়ে নির্বিচারে অন্য প্রজাতির মাছের পোনা নষ্ট করছে পোনা আহরণকারীরা- এমনটাই অভিযোগ সকলের। একটি চিংড়ি পোনার জন্য তারা গড়ে শতাধিক অন্য মাছের পোনা নষ্ট করে থাকে। অথচ একটু সচেতন হলেই অন্য মাছের পোনা নষ্ট না করেও চিংড়ি পোনা ধরা সম্ভব। এভাবে কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে পোনা আহরণের ফলে ধবংস হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।
মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০০০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর এক প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে দেশের উপকূলীয় এলাকায় বাগদা পোনাসহ চিংড়ি এবং অন্যান্য মাছের পোনা আহরণ নিষিদ্ধ করে। মৎস্য সংরক্ষণ আইন ১৫০-এ সেকশন-৩৩ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে মোহনা ও উপকুলীয় অঞ্চলে যে কোন ধরনের মাছের পোনা ধরা বা ধরতে সহযোগিতা করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার জন্য স্থানীয় মৎস্য বিভাগ বা থানা প্রশাসন কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না।
সোনাগাজী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইয়াছিন মজুমদার উপকূলীয় এলাকায় চিংড়ি পোনা ধরার সত্যতা স্বীকার করে জানায়, নদী থেকে পোনা ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একশ্রেণীর অসাধু মৎস্য আহরণকারী পোনা মাছ ধরছে। এভাবে অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি পোনা আহরণ করে কিছু দরিদ্র লোক উপকৃত হলেও এ পদ্ধতিতে চিংড়ি পোনা আহরণের ফলে এ অঞ্চলের নদীগুলোতে দিন দিন সামুদ্রিক অন্যান্য মাছের পোনা নষ্ট হচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়িত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। মাছ ধরার উপকরণ নষ্ট করছি।
সোনাগাজীর দক্ষিণ পূর্ব চরচান্দিয়া গ্রামের পোনা সংগ্রহকারী রহিম উদ্দিন (২৫), আবু তাহের (৪২), পরিমল চন্দ্র দাস (৩৭) ও ধনা মিয়া (২৬) জানায়- স্থানীয় মহাজনেরা তাদের কাছ থেকে পোনা মাছ ১ টাকা থেকে ২ টাকায় কিনে ৩ টাকা থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত ঘের মালিকদের কাছে বিক্রি করে। ফেনী থেকে ঢাকা, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষিরা জেলার চিংড়ি ঘেরগুলোতে পোনা পাঠানো হয়। শুধু সোনাগাজী এলাকা থেকেই দৈনিক লক্ষাধিক চিংড়ি পোনা বৃহত্তর ঢাকা ও খুলনা অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।
পোনা সংগ্রহকারীদের অভিযোগ শুষ্ক মৌসুমে পোনা ধরতে নদীতে যাওয়ার সময় জাল ও নৌকাসহ পোনা আহরণের সরঞ্জামাদি ক্রয় করার জন্য অনেক সময় তাদের হাতে কোন টাকাই থাকে না। তখন তারা বাধ্য হয়ে স্থানীয় মহাজন ও আড়তদারদের কাছ থেকে চক্রবৃদ্ধি হারে দাদন (ঋণ) নিয়ে থাকেন। শুধু সুদ দিলেই ঋণ পাওয়া যায় না। যার কাছ থেকে দাদনের টাকা নিবেন পোনা ধরার পর আবার তার কাছেই পোনাগুলো বিক্রি করতে হবে।
পোনা সংগ্রহকারী হারাধন চন্দ্র দাস ও মোশারফ হোসেন সরকারি বা বেসরকারিভাবে ক্ষুদ্র ঋণের সুবিধা পেতে আগ্রহী। তাদের দাবি সরকারিভাবে বা কোন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) যদি পোনা সংগ্রহকারীদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করে তাহলে তারা দাদনের মহাজুলুম থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে এবং পাশাপাশি তারা চিংড়ি পোনারও ন্যায্য মুল্য পেতো। দাদনের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে তাদের অনেকেরই মুলধনও হারিয়ে যায়। চরচান্দিয়া ইউপি চেয়ারম্যান সামছু্িদ্দন খোকন জানান, এ অঞ্চলের চিংড়ি পোনা বিশেষ করে গলদা চিংড়ির গুণগত মান খুবই উন্নত। খুলনা বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে এ চিংড়ি পোনার প্রচুর চাহিদা। এখানকার এ চিংড়ি পোনাকে অনেকেই হোয়াইট গোল্ড (সাদা সোনা) বলে আখ্যায়িত করে। এ ব্যাপারে উপজেলা চেয়ারম্যান জেড এম কামরুল আনাম জানান, উপকুলীয় এলাকার হাজার হাজার দরিদ্র মানুষ নদী থেকে চিংড়ি পোনা আহরণ করে এ মৌসুমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। তাদেরকে সরকারি বা বেসরকারি কিছু সহায়তা দিতে পারলে তাদের জীবনমান আর একটু ভাল হতো এবং চিংড়ি পোনা ধরতে গিয়ে অন্য প্রজাতির পোনা যেন নষ্ট না হয় সে দিকেও খেয়াল রাখতে পারত।
কিন্তু এভাবে অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি পোনা আহরণ করে কিছু দরিদ্র লোক সাময়িকভাবে উপকৃত হলেও এ পদ্ধদিতে চিংড়ি পোনা আহরণের ফলে দেদারসে নষ্ট হচ্ছে অন্য মাছের পোনা। নদী হয়ে পড়েছে মাছশূন্য। এভাবে নির্বিচারে পোনা ধরা বন্ধ করে মাছের বংশ ধ্বংস করার প্রক্রিয়া বন্ধ করার বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেয়া হবে এমনটায় আশা করছেন এখনকার সচেতন এলাকাবাসী।

