(২০ মে ২০১২)সূর্য ডুবতে চলেছে। ঘরে ফেরাদের দলে আছে মোহাম্মদ শাহজাহান। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ১৫ বছরের কিশোর ফেনী স্টেডিয়াম থেকে পা ফেলছে বাইরে। চোখে-মুখে মুগ্ধতা। ঢাকার কত খেলোয়াড় কাছ থেকে দেখা গেল! ২২ মাইল পেরিয়ে বাড়ি যাওয়ার বিড়ম্বনাটা তার কাছে তুচ্ছ।আরও অনেক শাহজাহানের সন্ধান মিলল কাল ফেনী স্টেডিয়ামে। ছাগলনাইয়া, দাগনভূঞা, পরশুরাম, সোনাগাজী, রামগড়সহ আরও অনেক দূর থেকে খেলা দেখতে এসেছে। এসব জায়গায় গোটা কুড়ি গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট হয়েছে গত ছয় মাসে। এখানকার তরুণেরা ফুটবলে বেশ আকৃষ্ট। স্থানীয় ফেনী সকার ৩-০ গোলে শেখ জামালের কাছে উড়ে গেছে, কিন্তু এঁদের কারোই তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই।
আগ্রহের কেন্দ্রে বরং আমিনুল। প্রথম মিনিটেই ব্যথা পেয়ে মাঠ ছাড়েন শেখ জামালের গোলরক্ষক ও অধিনায়ক। ঢাকায় আমিনুলরা অনাগ্রহের পাত্র। কিন্তু এখানে তাঁদের সঙ্গে ছবি তুলে ধন্য হয় অনেক কিশোর-তরুণ। খেলা দেখতে গ্যালারি উপচে পড়ে। গাছের ডালে ও বাড়ির ছাদে মানুষ।
কালও এই পরিবেশটা পাওয়া গেল ফেনী স্টেডিয়ামে। শুধু একদিকেই গ্যালারি, যেটি ৪-৫ হাজার দর্শকে পরিপূর্ণ। বাকি তিন অংশের দেয়ালের ওপর বসে খেলা দেখতে কারোই ক্লান্তি নেই।
কিন্তু স্টেডিয়ামের ভেতরটা বড় মলিন। মাঠের এক পাশে পরিত্যক্ত জিমনেসিয়াম। এটি যে দেশের সর্বোচ্চ পেশাদার ফুটবল লিগের ম্যাচ, কে বুঝবে! টাঙ্গাইলের মতো ফেনীতেও দুরবস্থার ইতরবিশেষ নেই। স্টেডিয়ামের ভেতরে-বাইরে গ্রামীণফোন বাংলাদেশ লিগ কথাটা লেখার অক্ষরে পাওয়া যায়নি। স্পনসরের একটা বিলবোর্ড পর্যন্ত নেই। বাফুফে কি উদাসীন?
বাফুফের তরুণ সহসভাপতি তাবিথ আউয়াল ছিলেন, কিন্তু তিনি তো এখানে ফেনী সকারের পৃষ্ঠপোষক। এ ছাড়া বাফুফের একজন কর্মকর্তা বা কর্মী এদিকটায় পা ফেলেন না। লিগ কমিটির সভাপতি সালাম মুর্শেদী কত কথা বলেন। সেসব বড় অসার মনে হয়।
মাঠের অবস্থা অসমতল। মাটি দেওয়া কয়েক জায়গায়। মাঝখানটা ন্যাড়া। ওটার ওপর ম্যাট বসিয়ে ২৬টি দল নিয়ে দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগ চলছে।
তাই স্থানীয় জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন অসহায়ভাবে বলে চলেন, ‘এই মাঠে কী হয় না বলেন! ক্রিকেট-ফুটবল-হ্যান্ডবল-কাবাডি, অ্যাথলেটিকস, স্কুলক্রীড়া—কিছুই বাদ যায় না।’
মজার ব্যাপার, জরাজীর্ণ স্টেডিয়ামের মূল ভবন তৈরির জন্য পৌনে দুই কোটি টাকা সরকারি বরাদ্দ হয়েছে, কিন্তু মাঠের জন্য কানাকড়ি নেই। ম্যাচ শেষেই শ-দুয়েক ছোট-বড় ছেলে দখল করে নিল মাঠটা। দেয়াল টপকে অবাধে বিচরণ। নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই।
তবে এখনো কোনো অঘটন না ঘটাটা স্বস্তির খবর। কাল এই মাঠে তিনটি পেশাদার লিগ মিলিয়ে ২৭তম ম্যাচ খেলেছে সকার, যার মধ্যে জয় ৫টি। মোট ৫৯টি ম্যাচে সকারের ২১টি ড্রয়ের অর্ধেকেরও বেশি এই মাঠে।
বলা হয়, সকারের মাঠ থেকে পয়েন্ট কাড়া কঠিন। স্থানীয় দর্শকই তাদের বড় শক্তি। কালও সেই শক্তির প্রকাশ দেখা গেল। কিন্তু সকারকে এবার মাঠে চেনা গেল না। কেস্টার, কোচ কাম খেলোয়াড় আপসু ও বদলি ফরোয়ার্ড সবুজের গোল এক ম্যাচ পর শেখ জামালকে ফিরিয়েছে জয়ে।
স্টেডিয়াম থেকে ৫০০ গজের মধ্যেই সকারের আবাসিক ক্যাম্প। একটা ছয়তলা ভবনের ওপরের তলায় ১০টি কক্ষ নিয়ে করা হয়েছে। থাকার ব্যবস্থা মোটামুটি ভালোই। খেলোয়াড়েরাও খুশি। তবে ছাদের নিচে হওয়ায় গরমটা একটু বেশি। দলের সিলেটের খেলোয়াড় মওদুদ রসিকতা করলেন, ‘লিফট নেই। হেঁটে উঠতে হয়। দিনে তিন-চারবার ওঠা মানে আমাদের মাসল পুল করার সম্ভাবনা খুবই কম!’
দুপুরে ওই ক্যাম্পে ঢুঁ মেরে দেখা গেল, সবাই মাঠে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। খুলনার ছেলে অধিনায়ক লুৎফর রহমানের কণ্ঠে ফেনীর প্রশংসা, ‘এখানকার মানুষ ফুটবল ভালো বোঝে। এই অঞ্চলের আনাচকানাচে ফুটবল হচ্ছে। অনেক বিদেশিই সেসব জায়গায় খেলে।’
এমনই যে, সকারের স্থানীয় ফুটবলার ইকবাল হোসেনকে দুপুরে এক কিশোর স্থানীয় ভাষায় বলল, ‘আইজ কি আন্নেগ (আপনাদের) খেলা আছে, ভাই? আঁই খেলা ছাইতাম (দেখতে) যাইয়ুম।’ বিখ্যাত ফুটবলার নবী চৌধুরীর শহরের এই কিশোরদের চোখে স্বপ্ন আঁকছে ফুটবল।
