(১১ মে ২০১২) ফেনীতে ম্যাজিস্ট্রেটকে (এসিল্যান্ড) লাঞ্ছিত করার ঘটনায় জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব কাটেনি। ওই ঘটনার পর থেকে উভয় প্রশাসনের দাপ্তরিক কাজ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ যৌথ সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
গত ৩ মে রাতে ফেনী মডেল থানা কম্পাউন্ডের ভেতর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গেলে ফেনী সদর উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এসিল্যান্ড) নজরুল ইসলামসহ ২ ভূমি কর্মকর্তা পুলিশের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন।
ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ফেনী মডেল থানার পরিদর্শক (ওসি) নাজিম উদ্দিনকে চট্রগ্রাম ও উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলামকে ফেনী পুলিশ লাইনে প্রত্যাহার করা হয়।
ফেনী মডেল থানা কম্পাউন্ডের ভেতর ৯৪ নং ফেনী মৌজার সাবেক সিএস ৮৩৮ দাগ, এসএ ১৩ দাগের ০৩ সরকারি খাস জমিতে পুলিশ কর্তৃপক্ষ ২০১০ সালে অবৈধ স্থাপনা (দোকান) নির্মাণ শুরু করে।পরে ভূমি বিভাগের বাধার মুখে সে নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
ফেনীর ভূমি বিভাগ শহরের দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় সরকারি খাস জায়গায় ২ মে ৩৫টি এবং ৩ মে ৩৭টি অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করে।ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন আখতার ও ফেনী সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) নজরুল ইসলাম এ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন।
গত ৩ মে রাত পৌনে ৮টার দিকে ফেনী মডেল থানার প্রবেশ গেট সংলগ্ন এ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গেলে সেখানে এসিল্যান্ড নজরুল ইসলাম ও পৌর সহকারী ভূমি কর্মকর্তা আবদুল মতিন ভূইয়া, সার্ভেয়ার খাদেমুল ইসলামকে পুলিশ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনার রাতেই ইউএনও শাহীন আখতার বিষয়টি লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান।
একটি আবেদন ফেনী জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মন্ত্রী পরিষদ সচিব, স্থানীয় সংসদ সদস্য, জনপ্রশাসনের সিনিয়র সচিব, পুলিশের আইজিপি ও চট্রগ্রামের ডিআইজিসহ ফেনীর পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব ও সাধারণ, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ফেনী পৌর মেয়রের কাছে অনুলিপি পাঠানো হয়।
ফেনী জেলা প্রশাসক ও ফেনী পুলিশ সুপারের কাছে পাঠানো অন্য আবেদনে ঘটনার সময় বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিট উল্লেখ করা হয়। তবে উভয় আবেদনে ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়- ওই ঘটনার সময় ফেনী মডেল থানার সামনে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে যান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ওই সময় ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজিম উদ্দিন ও উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলামসহ সঙ্গীরা অশালীন আচরণের একপর্যায়ে এসিল্যান্ড নজরুল ইসলামসহ পৌর ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও সার্ভেয়ারকে মারধর করেন।
দোষীদের বিরুদ্ধে পুলিশ আইন ১৮৬৯ এর সিআরপিসি এর ৩৩২,৩৩৩, ও ৩৫৩ ধারা মতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আবেদন জানানো হয়।
এদিকে ৩ মে উচ্ছেদ অভিযানে থাকা পুলিশের এমসিসি নং-৪২২/১২ এর কর্তব্যে প্রেরিত পুলিশ অফিসার কর্তৃক বহনীয় হুকুমনামা পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেখানে ইউএনও শাহীন আখতারের স্বাক্ষরে পুলিশের আগমনের সময় ১১টা ও প্রস্থান সন্ধ্যা ৭টা ০৩ মিনিট উল্লেখ রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য
ফেনীর পৌর কাউন্সিলর কোহিনূর আলম রানা, ব্যবসায়ী খোকন, রাশেদ, দিদারসহ একধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, রাত পৌনে ৮টার দিকে পুলিশ ছাড়াই ইউএনও শাহীন আখতারের নেতৃত্বে ফেনীর ভূমি বিভাগের লোকজন ঘটনাস্থলে আসেন।
এ সময় উচ্ছেদে ক্ষতিগ্রস্ত শতাধিক লোকও থানা চত্বরে অবস্থান করছিল। তারা থানায় নির্মাণাধীন স্থাপনা উচ্ছেদের চেষ্টা করেন। এ সময় ওসি নাজিম উদ্দিন ইউএনওকে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগের অনুরোধ করেন।
একপর্যায়ে ওসি স্কেলেটর চালককে আটকের হুমকি দিলে এসিল্যান্ড ওসিকে উচ্ছেদ অভিযানে বাধা দেওয়ার জন্য তাকে দুই বছরের কারাদণ্ডাদেশের হুমকি দেন।
এসময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্য ও উচ্ছেদে ক্ষতিগ্রস্ত দাবিদার যুবকরা এসিল্যান্ডসহ ভূমি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলা চালায়। পরে পুলিশ লাঞ্ছিতদের থানা ক্যাম্পাসের ভেতরে নিয়ে যায়।
পুলিশ সুপারের বক্তব্য
ফেনীর পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ এসিল্যান্ড নজরুল ইসলাম লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা স্বীকার করেন। তিনি জানান, দোষ পুলিশ না উচ্ছেদে ক্ষতিগ্রস্তদের তা উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত চলছে। যেহেতু পুলিশের সামনে ঘটেছে, সে কারণে পুলিশ এর দায় এড়াতে পারে না। এজন্য নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে ফেনী মডেল থানার ওসি নাজিম উদ্দিন ও এসআই সাইফুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এদিকে এঘটনায় সম্পৃক্ত জনপ্রশাসনের কাউকে প্রত্যাহার না করায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য
ফেনীর জেলা প্রশাসক আবদুল কদ্দুস খান বলেন, ‘বিষয়টির তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ হবে। তখন দোষী যেই হোক, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।
ফেনী সদর উপজেলা চেয়ারম্যানের বক্তব্য
ফেনী সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বিকম জানান, জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনকে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলতে সুপরিকল্পিতভাবে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে।
তদন্ত কমিটি গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণ
এঘটনায় সরকার গত ৭ মে উচ্চ পর্যায়ের জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের তিন সদস্যের যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করে।
কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব শওকত মোস্তফাকে প্রধান ও পুলিশের এআইজি (সিকিউরিটি সেল) মোহাম্মদ আলমগীর আলম এবং সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ আজাদুর রহমান মল্লিককে সদস্য করা হয়। তদন্ত কমিটি ৮ মে সকাল ১০টা থেকে টানা ৭ ঘণ্টা ফেনী সার্কিট হাউজে রুদ্ধদ্বার কক্ষে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলে উচ্ছেদের শিকার কয়েকজন লোক তদন্ত কমিটির কাছে ভূমি বিভাগের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। কমিটি সেখানে ৫ জনের বক্তব্য রেকর্ড করেন। তদন্ত কমিটির প্রধান তদন্ত সর্ম্পকে কিছু বলতে না চাইলেও ১০ মের মধ্যে তদন্ত কাজ শেষ হবে বলে তিনি জানান।
হাইকোর্টে মামলা
এ ঘটনায় গত ৭ মে হাইকোর্টের বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের বেঞ্চ ফেনী মডেল থানার পরিদর্শক নাজিম উদ্দিনকে আগামী ১৫ মে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন।
গত ৮ মে করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ফেনীর এসিল্যান্ডকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় ফেনী মডেল থানার ওসি নাজিম উদ্দিনকে কেন ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়া হবে না বিচারপতি মির্জা হোসেন হায়দার ও বিচারপতি খোরশেদ আলম সরকার তা জনতে চেয়ে সরকারের প্রতি রুল জারি করেছেন।

