পর্যটন সম্ভবনায় ফেনীর সাগর মোহনার নয়নাভিরাম মুহুরী

ছবি - বাদল
(২৪ সেপ্টেম্বর ২০১১) সামান্য উদ্যোগ পর্যটনের বিশাল সম্ভবনার দ্বার অবারিত করতে পারে সাগর মোহনার মুহুরী সেচ প্রকল্প। যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে ব্যাপক সম্ভবনা থাকা সত্ত্বেও কোটি কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

সমুদ্র সৈকত থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম-ফেনী জেলার সীমানার মনমুগ্ধকর এই পরিবেশ উপভোগ করতে প্রতিদিন দর্শনার্থীদের আগমন ঘটলেও পরিকল্পনার অভাবে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারছে না এলাকাটি।

ফেনী নদীর মিলিত স্থানে অবস্থিত এই মুহুরী সেচ প্রকল্পটি পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো সব ধরণের যোগ্যতাই যেন প্রকৃতির রয়েছে।

প্রকল্পটির পূর্বে ফেনী নদীর মনমুগ্ধকর পথচলা, উত্তরে দৃষ্টির সীমান্ত জুড়ে রয়েছে চিংড়ী ঘের, দক্ষিণে দেশের প্রথম নির্মিত সোনাগাজি বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প, পশ্চিমে নয়নাভিরাম সাগর মোহনা।

সাগর মোহনা হিসেবে দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় এই এলাকাটিতে ১৯৮৬ সালে সেচের জন্য সুইচ গেট এবং উভয় পর্শ্বে ৩ দশমিক ৫৬৫ কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ নির্মাণ এবং সবুজায়ন করা হলে জেলাবাসীসহ পার্শ্ববর্তী জেলার বাসিন্দাদের কাছে এর কদর বেড়ে যায় কয়েকগুন।

প্রকল্পটি চালুর পর থেকেই প্রতিদিন হাজার দর্শনার্থীর পদভারে মুখর হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ফেনী জেলা প্রশাসক আব্দুল কুদ্দুছ খান বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, ওই এলাকাটিসহ ফেনীকে পর্যটন জোন ঘোষণা করার জন্য ২ মাস আগে পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং পর্যটন কর্পোরেশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ফেনী এলাকায় বিজয় সিং দিঘী, ত্রিপুরার একমাত্র মুসলিম নবাব শমসের গাজির বাড়ি, কেল্লা, সুড়ঙ্গ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত শুভপুর ব্রিজ, ছাগলনাইয়াসহ বেশ কয়েটি স্থান রয়েছে যেগুলোর সামান্য উন্নয়ন করা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হতে পারে ফেনী এলাকা।

তিনি আরও বলেন, ‘এসব সম্ভাব্য পর্যটন এলাকাগুলোর মধ্যে মুহুরী প্রকল্প সবচেয়ে আকর্ষণীয় একটি স্থান। প্রকৃতিগতভাবেই এই এলাকাটি নিসন্দেহে নয়নাভিরাম বলতে হবে। প্রকৃতিকে নিজের করে পেতে হলে এই স্থানের বিকল্প পাওয়া কঠিন।’

তবে, শব্দ এবং পরিবেশ দূষণ এই এলাকাকে পিছিয়ে রেখেছে বলে তিনি দাবি করেন।

ফেনীর সন্তান জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এটিএম গোলাম মওলা চৌধুরী বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, সামান্য অবকাঠামো উন্নয়ন করা হলে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে এই প্রকল্পটি।

এখানে শুধুমাত্র পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রাতে অবস্থানের জন্য মোটেল এবং ভালোমানের খাবার হোটেলের ব্যবস্থা করা হলেই পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়ে উঠবে।

তিনি বলেন, ‘এই এলাকাটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, এখানে পর্যটক আকর্ষণের জন্য সবই রয়েছে। কৃত্রিম কোন কিছুর প্রয়োজন হবে না।’

এমনিতেই এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার লোক আসছে ভ্রমণ করতে। বিভিন্ন দিবসগুলোতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভীড় দেখা যায় বলে তিনি জানান।

ফেনী সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আব্দুর রহমান বিকম বাংলানিউজকে জানান, ভ্রমণ পিপাসুদের মনের খোরাক জোগানোর সব যোগ্যতা রয়েছে এই এলাকার।

তিনি বলেন, ‘এই এলাকায় চট্টগ্রাম এবং ফেনী জেলা থেকে যাতায়াতের জন্য পাকা রাস্তা রয়েছে। পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়তে হলে যোগাযোগ উন্নয়ন করতে কোনও ব্যায়েও হবে না।’

এখানে ঘুরতে আসা নোয়াখালী সরকারি মুজিব কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র মেহেদী হাসান বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমাদের দেশের অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, কিন্তু যথাযথ উন্নয়নের অভাবে আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। অথচ আমাদের পার্শ্ববতী দেশ নেপালের অর্থনীতির প্রধান আয় হচ্ছে পর্যটন খাত থেকে।’

তিনি বলেন, ‘এই স্থান খুবই সুন্দর, সে কারণেই এখানে বেশকয়েকবার আসা হয়েছে। কিন্তু এখানে কোনও ধরনের স্যানিটেশনের ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যায় পড়তে হয়। বিশেষ করে নারীদের দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে বেশি।’

কলেজ ছাত্রী লুনা আক্তার বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে এসেছেন এখানে। তিনি বলেন, ‘ভালো কিছু কিনে যে খাবো তার ব্যবস্থা নেই। একটি মাত্র অস্থায়ী দোকান রয়েছে, তাতেও ভালোমানের কোনও খাবার পাওয়া যায়না।’

তার মতে, ‘সাগর মোহনার রূপ দেখতে হলে সন্ধ্যায় যেতে হয়। কিন্তু এখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান ঝুকিপূর্ণ।’

মুহুরী প্রকল্প এলাকার পুলিশ ফাঁড়ির হাবিলদার জগদীশ বাংলানিউজকে জানান, প্রতিদিনেই শত শত লোক এখানে আসে।

নারীদের জন্য টয়লেটের কোনও ব্যবস্থা না থাকায় তারা খুব সমস্যায় পড়েন। নিরাপত্তা সমস্যার কথা উড়িয়ে দিলেও আরও নিরাপত্তাকর্মী বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদ কাদের বাংলানিউজকে জানান, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রত্যেক জেলার পর্যটন সম্ভাবনাময় স্থানের প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, ফেনী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই এলাকার প্রস্তাবনা পাওয়া গেছে। বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে।

যাতায়াত: ফেনী জেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই এলাকাটিতে যেতে হলে ফেনী থেকে হিউম্যান হলার এবং সিএনজিতে করে এখানে সহজেই পৌঁছা যায়। একই কায়দায় চট্টগ্রাম থেকেও এখানে আসতে হয়।