 |
| ফেনী নদীর পানিবণ্টন চুক্তি
বাস্তবায়নের পর ভারত আমলিঘাট সীমান্ত এলাকায় বাঁধ দিলে বিপর্যয় ঘটবে মুহুরী
প্রকল্পে। অকেজো হয়ে পড়বে সেচ প্রকল্পটি। ছবি : মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন |
মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন, মিরসরাই : (৬ সেপ্টেম্বর ২০১১) দেশের ষষ্ঠ বৃহত্তম সেচ প্রকল্প মিরসরাইয়ের মুহুরী প্রকল্পের একমাত্র ভরসা ফেনী নদীর পানি। কিন্তু এ নদীর পানিবণ্টন চুক্তির পর ভারত আমলিঘাট সীমান্ত এলাকায় বাঁধ দিলে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে পানি আটকালে বিপর্যয় নেমে আসবে মৎস্য ও কৃষি ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটানো মুহুরী সেচ প্রকল্পে। চুক্তি বাস্তবায়নের পর দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরে ফেনী নদীর পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি এরই মধ্যে স্থানীয় জনমনে আতঙ্ক ছড়াতে শুরু করেছে। স্থানীয় লোকজনের আশঙ্কা, ফেনী নদীর পানিবণ্টন চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বিপর্যয় নেমে আসবে মুহুরী প্রকল্পে। নদীর পানি শুকিয়ে গেলে কিংবা প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে এ প্রকল্পের আওতাধীন মৎস্য ও কৃষি কার্যক্রম চরম হুমকির মুখে পড়বে। ফেনী নদীর পানি দিয়ে মুহুরী প্রকল্পের আওতায় বছরে তিন হাজার মেট্রিক টন মাছ ও ৭৫ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত ফসল উৎপাদিত হয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় লাখো পরিবারের জীবন-জীবিকা। ফেনী জেলার ফেনী, সোনাগাজী, ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী, পরশুরাম ও চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মুহুরী সেচ প্রকল্প। প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয় ১৯৮৫-৮৬ সালে। এতে মোট ব্যয় হয় ১৫৬ কোটি ৮৬ লাখ ২৪ হাজার টাকা। এ প্রকল্পে রয়েছে সাত হাজার ৬৪৬ বর্গমিটার আয়তনের ইমারত, তিন দশমিক ৪১১ কিলোমিটারের একটি ক্লোজার ড্যাম, ৪০ গেটের একটি রেগুলেটর, আটটি নিষ্কাশন স্লুইস, ৫৯৮ কিলোমিটারের খাল, ৭৪টি ব্রিজ ও কালভার্ট, ৩৮ দশমিক ৯৬ কিলোমিটার প্রবেশপথ, ১১ দশমিক ২৭ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিশন লাইন, এক হাজার ১০০টি লো-লিফট পাম্প।
মুহুরী প্রকল্পকে ঘিরে রয়েছে পাঁচ হাজারেরও বেশি মৎস্য প্রকল্প। এসব প্রকল্পে উৎপাদিত মাছ দিয়েই পূরণ হয় পুরো চট্টগ্রামের ৭০ শতাংশ চাহিদা। বছরে প্রায় আড়াই শ কোটি টাকার মৎস্য উৎপাদিত হয় এ প্রকল্পের পানি থেকে। এ ছাড়া ফেনী নদীর সাতটি পয়েন্টে বালু উত্তোলন করা হয় সারা বছর। মৎস্য ও কৃষি চাষ এবং বালু উত্তোলনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে লাখো মানুষ। মুহুরী প্রকল্পের ওপরই নির্ভর করে এসব মানুষের জীবন-জীবিকা।
ফেনী জেলা কৃষি অফিসের উদ্ভিদ সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, মুহুরী প্রকল্পের সেচের আওতায় ফেনী জেলায় ১৫ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত ফসল উৎপাদিত হয়।
অপরদিকে এই প্রকল্পের সেচের আওতায় মিরসরাইয়েও প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন হওয়ার কথা জানান মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আউয়ুব আলী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে মুহুরী প্রকল্প বাস্তবায়নকালে ফেনী নদীর যে প্রশস্থতা ছিল, সেটি এখন আর নেই। সংকুচিত হতে হতে ৩৮৪ মিটার থেকে কমে ১০০ মিটারে নেমে এসেছে এ নদীর প্রশস্ততা। বর্ষায় থৈথৈ পানিতে এ নদী ভরে উঠলেও পানির হাহাকার লেগে থাকে দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে। ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত এ নদীতে কেবল ধু-ধু বালুচর দেখা যায়। মুহুরী প্রকল্পের ৪০ গেটের রেগুলেটরের মাধ্যমে আটকানো পানি দিয়ে দুঃসময়ে পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। ফলে এ যাবৎ মুহুরী প্রকল্পের মৎস্য ও কৃষি ক্ষেত্রে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
মুহুরী প্রকল্পের কারণে ফেনী এবং মিরসরাই অঞ্চলে মৎস্য ও কৃষি ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটেছে। এর পেছনের মূল সহায়ক হচ্ছে ফেনী নদীর পানি। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পর্বত শ্রেণী থেকে উৎপন্ন প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদী ভাগ করেছে দুই দেশকে। দীর্ঘ এ অঞ্চলে ফেনী নদীর পানির ওপর নির্ভর করে টিকে আছে লাখো মানুষের জীবিকা। কিন্তু ভারত এ নদীর পানিতে ভাগ বসালে ব্যাহত হবে মুহুরী প্রকল্পের কার্যক্রম। নদীতে পানি সরবরাহ কমে গেলে লাখো হেক্টর আবাদি জমিতে ইরি মৌসুমের চাষাবাদ বন্ধ হয়ে যাবে। পাশাপাশি চিরতরে বন্ধ হবে বালু উত্তোলন।
এদিকে বাঁধ না দিয়ে অন্য কোনো উপায়ে পানি নিলে মুহুরী সেচ প্রকল্পে নেতিবাচক প্রভাব তেমন একটা পড়বে না বলেও জানা গেছে। উদ্ভিদ সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ফেনী নদীর পানিবণ্টন চুক্তিতে কী থাকছে তা জানি না। যদি বাঁধ দিয়ে ভারত পানি নেওয়ার ব্যবস্থা করে তাহলে মুহুরী সেচ প্রকল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।'
স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, পানিবণ্টন প্রক্রিয়ায় ভারত বাঁধ দেবে না কি পাইপলাইন বসাবে তারা এর কিছুই জানে না। ফেনী নদীর ওপরের অংশে ভারত, আর নিচের অংশে বাংলাদেশ। ফলে এ নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে এ দেশের মানুষ। বাঁধ অথবা পাইপলাইন_দুটি উপায় অবলম্বন করে ভারত ফেনী নদীর পানি নিয়ে গেলে মরুভূমিতে পরিণত হবে নদীর নিম্নাঞ্চল। ফেনী নদীর পানিবণ্টন প্রক্রিয়ায় যাতে মুহুরী প্রকল্পে নেতিবাচক কোনো প্রভাব না পড়ে সেদিকে সরকারের সজাগ দৃষ্টি কামনা করেন এলাকাবাসী।
আমলিঘাট সীমান্তে ফেনী নদীর পারে মানববন্ধন
ভারতের সঙ্গে ফেনী নদীর পানিবণ্টন চুক্তিতে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে এবং এর ন্যায্য হিস্যার দাবিতে আমলিঘাট সীমান্তে গতকাল সোমবার মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। নদীর পারে মানববন্ধন ও সমাবেশ শেষে বিকেলে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
মিরসরাই পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ফোরামের উদ্যোগে এসব কর্মসূচি পালিত হয়। সমাবেশে বক্তারা বলেন, ফেনী নদী মুহুরী সেচ প্রকল্পের প্রাণ। এ নদীর অববাহিকায় লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা। ভারতকে এ নদী থেকে পানি নেওয়ার অনুমতি দিলে দেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যাবে।
সাধারণ সম্পাদক মঈন উদ্দিন আহমদ চৌধুরী সেলিমের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. জামসেদ আলম, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন, অধ্যক্ষ কবির হোসেন চৌধুরী, ইতিহাসবিদ আহমদ মমতাজ, কবি মাহমুদ নজরুল, শিক্ষক সুভাস সরকার ও মহিউদ্দিন মজুমদার, মুক্তিযোদ্ধা মো. মনজু, ইউপি সদস্য মোজাম্মেল হক মিরু প্রমুখ।