(৫ সেচ্টেম্বর ২০১১) এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাইয়ের আমলীঘাট সীমান্ত ঘুরে: ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশে আগমন উপলক্ষে তাকে স্বাগত জানাতে প¯ু‘ত রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ-ভারত বিভিন্ন বিষয়ে চুক্তি নিয়ে এ দেশের মানুষের মাঝে যেমনি আগ্রহ দেখা গেছে, তেমনি উদ্বিগ্ন, উৎকন্ঠায়ও রয়েছে তারা। মনমোহনের বাংলাদেশ সফরে বেশ কয়েকটি প্রস্তাবিত চুক্তির মধ্যে ফেনী নদীর পানি বন্টন চুক্তির বিষয়টিও রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ফেনী নদীর পানি বন্টন চুক্তি নিয়ে চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকুন্ড ও ফেনী জেলার মানুষের মধ্যে আগ্রহের পাশাপাশি পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়েও বাড়ছে উৎকন্ঠা । ভারতের সাথে পানি বন্টনের কি চুক্তি হচ্ছে তা জানেনা এলাকাবাসী। ফেনী নদীতে বাঁধ হবে নাকি পাইপ দিয়ে পানি নেয়া হবে। যদি বাঁধ দিয়ে পানি নেয়া হয় তাহলে চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকুন্ড, দেশের ষষ্ঠ মুহুরী প্রকল্প, ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া, সোনাগাজী, ফুলগাজী, পরশুরাম মরু ভূমিতে পরিনত হতে পারে বলে আশংকা করছেন এলাকাবাসী। পানি প্রবাহ কম থাকায় ও শুষ্ক মৌসুমে চাহিদামত পানির অভাবে চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলার লক্ষাধিক হেক্টর জমিতে ইরি সেচ হুমকির মুখে পড়তে পারে বলেও স্থানীয়দের আশংকা। গত কয়েকদিন ধরে মিরসরাইজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে একটি খবর- বাংলাদেশ সীমান্তের ফেনী নদীতে পুকুর খনন করছে ভারত। মানুষের মুখে মুখে প্রচারিত এ খবরের সূত্র ধরে সংশিষ্ট ওই সীমান্ত এলাকা ঘুরে এ প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে নানা তথ্য। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যেও আগরতলা জেলার উপেন্দ্রনগর ও মিরসরাইয়ের আমলীঘাট সীমান্তে এখন চলছে উত্তেজনা। বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের পুকুর খননের খবরটি ছিল স্রেফ গুজব। কিন্তু ফেনী নদী থেকে বালু উত্তোলন করে সীমান্তবর্তী ফেনী নদীর পারে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ভারতের বক তৈরির দৃশ্য চোখে পড়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার (৬ সেপ্টেম্বর) ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফর ও কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর নিয়েও এখানে ছড়িয়ে পড়েছে উত্তেজনা। দল-মত নির্বিশেষে এলাকার সকল স্তরের মানুষের একটাই প্রশ্ন- চুক্তিতে কি আছে? ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের সঙ্গে যে কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে, তার মধ্যে অন্যতম ফেনী নদীর পানি বণ্টন। আমলীঘাট সীমান্তের শত কিলোমিটারেরও বেশি পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পর্বত শ্রেণীতে উৎপন্ন দীর্ঘ এ নদীটি বিভক্ত করেছে দুই দেশকে। উভয় দেশের ছোট-বড় খাল-ছড়া মিলিত হয়েছে এ নদীতে। আর এ নদীটি সর্বশেষে মিলেছে বঙ্গোপসাগরে। এ নদীর পানির ওপর নির্ভর করে আছে কয়েক লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। ভারত এ নদীর পানি নিয়ে গেলে দেশের ষষ্ঠ বৃহত্তম সেচ প্রকল্প মুহুরী প্রকল্প ছাড়াও লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকীর মুখে পড়ার আশংকা রয়েছে। গতকাল রোববার (৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ভারতের সীমান্তবর্তী মিরসরাইয়ের করেরহাট ইউনিয়নের আমলীঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, নদীর ওপারে বিএসএফের উপস্থিতে এক বছর পুর্ব থেকে লাথ লাখ লাখ ভারত সীমান্তে বক তৈরি করছে শ্রমিকরা। বক তৈরির কারণ দেখিয়েছে তারা নদীর ভাঙ্গন রোধ। এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত ১০ বছরে ফেনী নদীর ওপারে (ভারত সীমান্ত) ১০ গজ জায়গাও নদীতে ভাঙেনি। অথচ বছরের পর বছর ফেনীর ভয়াল গ্রাসে বাংলাদেশ সীমান্তের করেরহাট এলাকায় বাড়িঘর, ফসলী জমি নদীতে চলে যায়। এ ব্যপারে অবশ্যই ভারতের কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, তারা শুনেছেন মূলত ফেনী বাঁধ দিতে এক বছর আগে থেকেই ভারতের উপন্দ্রেনগর এলাকার ৫টি পয়েন্টে বকগুলো তৈরি করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিজিভি আমলীঘাট ক্যাম্পের এক কর্মকর্তা জানান, আমারা দুই মাস পুর্বে তাদের বক তৈরি করে বাঁধা দিই এবং তা দুইমাস বন্ধ থাকে। কিন্তু বিজিভির উধ্বতন কতৃপক্ষের কাছ থেকে আমাদের কাছে চিঠি আসে বক তৈরিতে বাঁধা প্রদান না করতে । বরং তাদের কে সহযোগীতা করতে চিঠিতে উলেখ করা হয়। আগামী মঙ্গল ও বুধবার (৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর) মনমোহনের সফরসঙ্গী হিসেবে পাঁচ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে রয়েছেন ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারও। ফলে ত্রিপুরা রাজ্য সংশিষ্ট ফেনী নদীর পানি বণ্টনের চুক্তিটি বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রায় পরিষ্কার। চুক্তি বাস্তবায়নের পর বিপর্যয়ের আশংকা : ফেনী নদীর পানি বণ্টন চুক্তি বাস্তবায়ন হলে বিপর্যয় নেমে আসবে ফেনী, ছাগলনাইয়া, পরশুরাম, ফুলগাজী, সোনাগাজী ও মিরসরাই অঞ্চলে। বিশেষ করে ১৯৮৪ সালে বাস্তবায়ন হওয়া মুহুরী প্রকল্প বড় ধরণের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। দেশের ষষ্ঠ বৃহত্তম এ প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেচ, আবাদ ও মৎস্য চাষে বিপর্যয়ের পাশাপাশি বালু উত্তোলন প্রক্রিয়া বন্ধ হবে। এসব বিপর্যয়ে একদিকে সরকার বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হবে, অন্যদিকে পথে বসবে কয়েক লাখ পরিবার। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেনী নদীর পানি বণ্টন চুক্তি বাস্তবায়নের পর উভয় দেশ সম-পরিমাণ পানি পাবে। মিরসরাইয়ের আমলীঘাট সীমান্ত ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উপেন্দ্রনগর সীমান্ত দিয়ে পানি বণ্টন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন হবে। এর প্রস্তুতি হিসেবে বছরখানেক ধরে ভারত নির্মাণ করে রাখছে কয়েক লাখ বক। ওই সীমান্ত এলাকায় নদীতে বক বসালে কিংবা পাইপের মাধ্যমে পানি আটকালে মরুভূমিতে পরিণত হবে নদীর নিুাঞ্চল। আমলীঘাট থেকে বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ চ্যানেল পর্যন্ত নদী শুকিয়ে যাবে। এসময় ওপরের দিকে গড়াবে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি। একপর্যায়ে তা ছড়িয়ে পড়বে বিস্তীর্ণ এলাকার আবাদী জমি ও মৎস্য প্রকল্পগুলোতে। বাড়বে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব। সবমিলিয়ে কঠিন দুর্যোগপুর্ণ পরিস্থিতিতে পড়বে বাংলাদেশ। ১৫৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নকৃত মুহুরী প্রকল্পের আওতায় বছরে অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন হয় ৭৫ হাজার মেট্টিকটন। এ প্রকল্পকে ঘিরে রয়েছে পাঁচ হাজারেরও বেশি মৎস্য প্রকল্প। এসব প্রকল্পে উৎপাদিত মাছ দিয়ে মেটে পুরো চট্টগ্রামের ৭০ ভাগ মৎস্য চাহিদা। বছরে প্রায় আড়াইশ কোটি টাকার মৎস্য উৎপাদন হয় এ প্রকল্পের পানি দিয়ে। মৎস্য ও ফসল উৎপাদনের এ সাফল্যের পেছনের মূল সহায়ক ফেনী নদীর পানি। ভারত এ নদীর পানিতে ভাগ বসালে ব্যাহত হবে মুহুরী প্রকল্পের এসব উৎপাদন। এ নদীতে পানি সরবরাহ কমে গেলে লাখো হেক্টর আবাদী জমিতে ইরি মৌসুমের চাষাবাদ বন্ধ হয়ে যাবে। এ ছাড়া ফেনী নদীর সাতটি পয়েন্টে বালু উত্তোলন হয় সারাবছর। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। আমলীঘাট থেকে পানি সরবরাহ বন্ধ হলে কিংবা সম-পরিমাণ পানি ভারতের দিকে সরিয়ে নিলে বালু উত্তোলন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। করেরহাট ইউনিয়নের স্থানীয় ইউপি সদস্য মোজাম্মেল হক মিরু বলেন, ভারত বক ফেলা শুরু করে দিয়েছে। এতে করে বাংলাদেশ অংশে নদী ভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করবে। এ ছাড়া পানি বণ্টন চুক্তি বাস্তবায়ন হলে ফেনী নদীর মিরসরাই অংশ মরুভূমিতে পরিণত হয়ে সবকিছু অচল হয়ে যাবে। চুক্তিতে কি আছে জানতে চায় এলাকাবাসী : মনমোহনের সঙ্গে ফেনী নদীর পানি বণ্টন নিয়ে কি চুক্তি হচ্ছে তা জানতে চায় দেশের মানুষ। নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে গোপন চুক্তি করা হচ্ছে উলেখ করে সীমান্তবর্তী মানুষ দাবী করেছে, এ চুক্তি বাংলাদেশের মানুষের জন্যে সর্বনাশা। সরেজমিনে গেলে ইতিহাসবিদ আহমদ মমতাজ, শিক্ষক হেদায়েত উল্যাহ, আবদুল মান্নান, মোহাম্মদ আলী, জাকির হোসেনসহ ওই এলাকার অর্ধশতাধিক বাসিন্দা এ প্রতিবেদককে বলেন, আমরা জানতে চাই ফেনী নদীর পানি বণ্টন চুক্তিতে কি কি হচ্ছে। এটা সরকারের কাছে আমাদের অধিকার। আমরা চাই দেশের স্বার্থ রক্ষা থাকবে এমন কিছু করবে সরকার। তারা আরও জানান, পানি বণ্টন প্রক্রিয়ায় ভারত বাঁধ দেবে, না কি পাইপলাইন বসাবে? আমরা এর কিছুই জানি না। ফেনী নদীর ওপরের অংশে ভারত, আর নিচের অংশে বাংলাদেশ। ফলে এ নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে এ দেশের মানুষ। বাঁধ অথবা পাইপলাইন- দুটি উপায় অবলম্বন করে ভারত ফেনী নদীর পানি নিয়ে গেলে মরুভূমিতে পরিণত হবে নদীর নিুাঞ্চল। এ দিকে দেশের গুরুত্বপূর্ন একটি ইস্যু নিয়ে বিরোধীদলের কোন ভূমিকা নেই বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী। তারা জানান, ফেনী নদীর পানি বন্টন চুক্তি বাতিলের দাবীতে বিরোধীদল কোন কর্মসূচি পালন না করায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে একালাবাসীর মাঝে। অবশ্যই মিরসরাইয়ের সীমান্তবর্তী আমলীঘাট এলাকায় গিয়ে ওই এলাকার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলেছেন মিরসরাই উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আউয়াল চৌধুরী, জাসাসের কেন্দ্রীয় নেতা শাহীদুল ইসলাম চৌধুরীসহ বেশকয়েকজন বিএনপি নেতা। এলাকার বাসিন্দারা জানান, ঈদের পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে ওই এলাকায় যান মিরসরাইয়ের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। এলাকার বাসিন্দারা এসময় তাকে বিষয়টি অবহিত করেন। কিন্তু তিনি কাউকে কোন বিষয়ে আশ্বস্ত করেননি। ফেনী নদীর পানি বণ্টন চুক্তিকে এ দেশের জন্যে সর্বনাশা সিদ্ধান্ত আখ্যায়িত করে এলাকার বাসিন্দারা সরকারের বিবেচনা কামনা করেছেন। পাশাপাশি এ ব্যাপারে বিরোধীদলের জোরদার ভূমিকা পালনেরও আহ্বান জানান এলাকাবাসী। ফেনী নদীর পানি বণ্টন চুক্তির আওতায় কি হচ্ছে তা জানেন না মিরসরাইয়ের সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনও। যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও এ বিষয়টি সম্পর্কে কিছু জানি না।’ স্থানীয়রা চুক্তিতে কি আছে তা জানতে চায়- এমন কথা শুনে তিনি বলেন, ‘আমি জেনে তারপর জানাব’।

