(১৬ জুলাই ২০১১) ফেনীর
সোনাগাজী উপজেলার চরদরবেশে ‘ছোট ফেনী’ নদীর ওপর নির্মিত কাজিরহাট
রেগুলেটরটি চার বছর আগে নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। একই নদীর ওপর মুছাপুরে
নির্মাণাধীন রেগুলেটরেরও কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হয়নি। এতে করে চার বছর ধরে
ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেলার হাজার হাজার হেক্টর জমিতে ইরি-বোরোসহ
রবিশস্য চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানিতে
লবণাক্ততা না থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে যখন সেচ দিয়ে চাষাবাদ শুরু হয় তখন
জোয়ারের সঙ্গে লোনা পানি ঢোকে।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, ১৯৬৫ সালে চরদরবেশ এলাকায় ‘ছোট ফেনী’
নদীর ওপর ২০ ভেন্টের একটি রেগুলেটর (স্লুইসগেট) নির্মাণ করা হয়। রেগুলেটর
নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল নদীভাঙন রোধ ও বন্যার ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা, বর্ষা
মৌসুমে দ্রুত পানি অপসারণ, শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করে সেচের মাধ্যমে
কৃষি উত্পাদন করা। রেগুলেটর নির্মাণের পর ফেনীর সোনাগাজী, ফেনী সদর ও
দাগনভূঞা, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ ও সেনবাগ এবং কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম,
নাঙলকোর্ট, লাকসাম ও কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার মানুষ শুষ্ক মৌসুমে নদীর
পানি দিয়ে চাষাবাদ শুরু করে।
ফলে এসব এলাকায় ইরি-বোরো ও রবিশস্য চাষের মাধ্যমে কৃষিতে ব্যাপক সাফল্য
আসে। ছোট ফেনী নদীর দুই পাশে শত শত পাম্প মেশিন বসিয়ে জমিতে সেচ দেওয়া হতো।
এদিকে অনিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও অযত্ন-অবহেলায় দিন দিন কাজিরহাট রেগুলেটরটি
তার কার্যকারিতা হারাতে থাকে। একপর্যায়ে ২০০৫ সালে জোয়ারের পানিতে
রেগুলেটরের উত্তর অংশের ৫টি গেট একসঙ্গে ভেঙে নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। ২০০৬
সালে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ক্রস বাঁধ নির্মাণ করে ওই পাঁচটি গেট
পুনর্নির্মাণ করা হয়। একই বছর প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজিরহাট রেগুলেটরের
রি-মডেলিং কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার আগেই ২০০৭ সালের ২০
সেপ্টেম্বর রাতে প্রবল বন্যা ও জোয়ারের পানির চাপে রেগুলেটরের পুরনো ১৩টি
ভেন্ট (গেট) নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
এছাড়া রেগুলেটরের ভাটিতে নতুন বসতি স্থাপন ও পলি জমে যাওয়ায় কাজিরহাট
রেগুলেটর থেকে আরও প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ
উপজেলার মুছাপুরে ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৩ ভেন্টের (গেট) আরও একটি রেগুলেটর
নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০০৬-০৭ সাল থেকে মুছাপুরে
রেগুলেটর নির্মাণের কাজও শুরু করা হয়। ২০০৯-১০ অর্থবছরে মুছাপুর রেগুলেটরের
কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। ২০০৬, ২০০৭ ও ০৮ সালে নদীতে নাব্যতা সৃষ্টির জন্য
রেগুলেটরের উজানে নদী খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা খরচ
করে চারটি পৃথক গ্রুপে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে রেগুলেটরের মুখ থেকে
কাজিরহাট বাজার পর্যন্ত নদী পুনঃখনন করা হয়। বর্তমানে ওই খননকৃত খালের অংশ
আবার ভরাট হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। এদিকে ২০০৭ সালে কাজিরহাট
রেগুলেটরের পুরনো ১৩টি গেট নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর ছোট ফেনী নদীর সঙ্গে
বঙ্গোপসাগরের সরাসরি সংযোগ গড়ে ওঠে। শুরু হয় প্রতিনিয়ত জোয়ার-ভাটা। প্রতি
২৪ ঘণ্টায় নদীতে দুদফা জোয়ার আসে। বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানিতে লবণাক্ততা
না থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে যখন সেচ দিয়ে চাষাবাদ শুরু হয় তখন জোয়ারের সঙ্গে
লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ে। এ লবণাক্ত পানি দিয়ে চাষাবাদ হয় না। ফলে চার বছর
ধরে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি অনাবাদি থেকে যাচ্ছে। কৃষি উত্পাদন
দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফেনীর সদর উপজেলার শর্শদির কৃষক আবুল খায়ের জানান,
ওই এলাকায় তারা বছরে তিনটি ফসল উত্পাদন করতেন।
ফেনীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকউল্লাহ জানান,
কাজিরহাট রেগুলেটরটি ৪৫ বছর আগের পুরনো টেকনোলজিতে নির্মাণ করা হয়। মুছাপুর
রেগুলেটরটি নির্মাণ শেষে কাজিরহাট রেগুলেটরটি শুধু সড়ক হিসেবে ব্যবহারের
পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু জোয়ারে পানিতে সেটি তলিয়ে যাওয়ায় এখন সড়কও থাকল না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী এক বছরের মধ্যে ক্লোজার ড্যাম নির্মাণের
মাধ্যমে মুছাপুর রেগুলেটরটি চালু করা গেলে ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লার ১১টি
উপজেলার ১ লাখ ১ হাজার ৮৪৫ হেক্টর জমিতে সেচের মাধ্যমে ইরি-বোরো চাষাবাদ
করা সম্ভব হবে।
