(১৮ এপ্রিল ২০১১): ফেনীর সোনাগাজীর উপকুলীয় এলাকায় বর্তমানে চিংড়ি পোনা আহরণের
ধুম পড়েছে। ‘ফেনী নদী’র (বড় ফেনী নদী হিসাবে পরিচিত)-মুহুরী সেচ প্রকল্প
এলাকা থেকে শুরু করে উপকূলীয় ভাটি এলাকায় নদীর দু’কুল (দুই পাশ) ঘেষে
চট্টগ্রামের মিরস্বরাই উপজেলাধীন ইছাখালী এলাকা পর্যন্ত এবং ছোট ফেনী নদীর
কাজির হাট রেগুলেটরের ভাটিতে দক্ষিণে সন্দ্বীপ চ্যানেল পর্যন্ত বিশাল
উপকুলীয় এলাকার প্রতিদিন চিংড়ি পোনা ধরা হচ্ছে। এতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ
শুধু নদীতে চিংড়ি পোনা ধরে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে,দিনে-রাতে পালা করে এখানকার ছেলে বুড়ো সব
বয়সী মানুষ,এমনকি ৮-১০ বছরের শিশুরাও চিংড়ি পোনা সংগ্রহে তাদের বাবা অথবা
ভাইকে সাহায্য করছে। তারা মনে করে বছরের জানুয়ারী থেকে মে পর্যন্ত এ
উপকুলীয় এলাকায় চিংড়ি পোনা আহরণের উপর্যুক্ত সময়। উপকুলীয় এলাকার হতদরিদ্র
মানুষগুলের জন্য বছরের এ সময়গুলোতে অন্য কোন আয় রোজগারের সুযোগ না থাকায়
তারা চিংড়ি পোনা ধরে বিক্রি করাকে তাদের একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে।
চিংড়ি পোনা আহরণকারীরা নদী ও খালের মুখ থেকে ‘মশারীর জাল’ব্যবহার করে
সামুদ্রিক (প্রাকৃতিক)-গলদা ও বাগদা চিংড়ি পোনা সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে
সংগ্রহকৃত পোনা গুলোকে স্থানীয় মহাজন বা আড়ৎদারদের নিকট বিক্রি করে।
সোনাগাজীর দক্ষিণ পূর্ব চরচান্দিয়া গ্রামের পোনা সংগ্রহকারী আবু তাহের
(২৫) রহিম উদ্দিন (৪২) ধনা মিয়া (৩৭) ও পরিমল চন্দ্র দাস (২৬)
জানায়,স্থানীয় মহানজনরা পোনা সংগ্রহকারীদের নিকট থেকে প্রতিটি পোনা ১ টাকা
থেকে ১.৫০ টাকা দামে কিনে তাদের নিজ নিজ আড়তে জমা করে। সেখানে
প্রক্রিয়াজাত বড় বড় পাতিলের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা,
বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার চিংড়ি ঘের গুলোতে চালান করে থাকে। এখানকার
প্রান্তিক পোনা সংগ্রহকারীদের থেকে সংগৃহীত পোনাগুলোকে প্রতিটি ৪/৫ টাকা
দরে মহাজনরা চিংড়ি ঘেরের মালিকদের নিকট বিক্রি করে। পোনা সংগ্রহকারী আবুল
হাশেম (৪৫), নির্মল চন্দ্র সাহা (৩০) ও আবদুল খালেক (৩১) জানায়, এ অঞ্চলে
জোয়ার ভাটায় দিনে রাতে একদল পোনা সংগ্রহকারী গড়ে প্রতিদিন ১৮০ থেকে ২৫০টির
মত চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করে থাকে। এতে তাদের দৈনিক ২০০ থেকে ৫০০ টাকার মত
আয় হয়।
পোনা সংগ্রহকারীদের অভিযোগ,তারা পোনা ধরার জন্য নদীতে যাওয়ার সময় জাল ও
নৌকা কেনার জন্য হাতে কোন টাকা থাকে না। তখন বাধ্য হয়ে স্থানীয় মহাজন ও
আড়ৎদারদের নিকট ধর্না দিয়ে চড়া সুদে ঋন (দাদন) নিতে হয়। শুধু সুদ দিলেই ঋন
পাওয়া যায়না, যার নিকট থেকে সুদে টাকা নিবে, পোনা ধরার পর আবার তার কাছেই
পোনাগুলি বিক্রি করতে হবে। শুধু এ শর্তেই ঋন পাওয়া যায়। অন্যথায় কেউ ঋন
দেবে না। পোনা সংগ্রহকারী হারাধন চন্দ্র দাস ও মোশারফ হোসেন সরকারী বা
বেসরকারী ভাবে ক্ষুদ্র ঋণের সুবিধা পেতে আগ্রহী। তাদের দাবি সরকারীভাবে বা
কোন বেসরকারী সংস্থা (এনজিও)-যদি পোনা সংগ্রহকারীদের জন্য সল্পসুদে ঋনের
ব্যবস্থা করে তাহলে তারা দাদনের মহাজুলুম থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে
এবং পাশাপাশি তারা চিংড়ি পোনারও ন্যায্য মুল্য পেতো। দাদনের টাকা পরিশোধ
করতে গিয়ে তাদের অনেকেরই মুলধনও হারিয়ে যায়।
পোনা আহরণকারীরা জানায়,মুহুরী সেচ প্রকল্প এলাকার মিঠা পানির স্রোতের সাথে
পাওয়া সমুদ্রের চিংড়ি গুলো এ অঞ্চলের উজানের দিকে বেশি ভিড় করে। তাই এখানে
দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে বেশি চিংড়ি পোনা আহরিত হয়। উপকুলীয় এলাকার
চরখোন্দকার গ্রামের আবু তাহের ও আবদুল করিম জানান,শুধু সোনাগাজী এলাকা
থেকে দৈনিক শতাধিক বড় পাতিলে অন্তত লক্ষাধিক চিংড়ি পোনা বৃহত্তর খুলনা
অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। এদিকে স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ,কিছু লোক চিংড়ি পোনা
ধরতে গিয়ে নির্বিচারে অন্য প্রজাতির মাছের পোনা নষ্ট করে ফেলে। একটি চিংড়ি
পোনার জন্য তারা গড়ে শতাধিক অন্য মাছের পোনা নষ্ট করে থাকে। তারা একটি
সচেতন হলে অন্য মাছের পোনা নষ্ট না করেও চিংড়ি পোনা ধরতে পারে।
সোনাগাজী উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা জাকির হোসেন উপকূলীয় এলাকায়
চিংড়ি পোনা ধরার সত্যতা স্বীকার করে জানায়,এ ভাবে অপরিকল্পিত ভাবে চিংড়ি
পোনা আহরণ করে কিছু দরিদ্র লোক উপকৃত হলেও এ পদ্ধতিতে চিংড়ি পোনা আহরণের
ফলে এ অঞ্চলের নদীগুলোতে দিন দিন সামুদ্রিক অন্যান্য মাছের পোনা নষ্ট
হচ্ছে এবং নদী গুলো মাছ শুন্য হয়ে পড়ছে। চরচান্দিয়া ইউপি চেয়ারম্যান
সামছু্িদ্দন খোকন জানান,এ অঞ্চলের চিংড়ি পোনা বিশেষ করে গলদা চিংড়ির গুণগত
মান খুবই উন্নত। খুলনা বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে এ চিংড়ি পোনার প্রচুর
চাহিদা। এখানকার এ চিংড়ি পোনাকে অনেকেই হোয়াইট গোল্ড (সাদা সোনা)-বলে
আখ্যায়িত করে। এ ব্যাপারে উপজেলা চেয়ারম্যান জেড এম কামরুল আনাম
জানান,উপকুলীয় এলাকার হাজার হাজার দরিদ্র মানুষ নদী থেকে চিংড়ি পোনা আহরণ
করে এ মৌসুমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। তাদেরকে সরকারী বা বেসরকারী কিছু
সহায়তা দিতে পারলে তাদের জীবনমান আর একটু ভাল হতো এবং চিংড়ি পোনা ধরতে
গিয়ে অন্য প্রজাতির পোনা যেন নষ্ট না হয় সে দিকে খেয়ার রাখতে পারত।

