ফেনীতে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে চলছে ইটভাটা নির্মাণ ও মাটি কাটা :: কৃষি ও পরিবেশ হুমকির মুখে


(০৭  ফেব্রুয়ারী ২০১২) ফেনীতে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে চলছে ইটভাটা নির্মাণ- কৃষি জমির মাটি কাটা। ফলে পরিবেশ ও কৃষি জমি হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে। থেমে যাচ্ছে উৎপাদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ পরিবেশ উন্নয়নে।অভিযোগ রয়েছে ইট ভাটা নির্মাণের কাছাকাছি স্থান থেকে ফসলী জমির উর্বর মাটি ৩ থেকে ৪ ফুট নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফেনী জেলার বিভিন্ন স্থানে ফসলি জমির উপরের উর্র্বর অংশ কেটে নিয়ে যাচ্ছে নতুন ইটভাটায়। এতে কৃষকদের ফসলী জমির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। মাটি নিয়ে ইট ভাটার মাটির চাহিদার জোগান দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন রাস্তার পাশে ফসলী জমি ভরাট করে নতুন বাড়ী বানানোর জন্য উচু করা হচ্ছে। জেলার রাজস্ব অফিস সূত্রে জানা গেছে, ফেনী জেলায় লাইসেন্সভুক্ত ইট ভাটার সংখ্যা হচ্ছে ১’শ ৩৮টি। এর মধ্যে ফেনী সদরে রয়েছে ৫৩টি। সোনাগাজীতে রয়েছে ৩৫টি, ছাগলনাইয়ায় ১৫টি, পরশুরামে ২টি, ফুলগাজীতে ৯টি, দাগনভূঞায় ২৪টি। সূত্র জানায়, লাইসেন্স ছাড়াও কিছু ব্রিক ফিল্ড ইতিমধ্যে গড়ে উঠেছে। যার সঠিক পরিসংখ্যান সরকারী অফিসে নেই। াকৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, তারা কৃষকদের সতর্ক করার পরও অতিরিক্ত অর্থের আশায় কৃষকেরা না বুঝে ফসলী জমির উর্বর অংশ প্রায় ৩ থেকে ৪ ফুট বিক্রি করে দিচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে উপজেলার পৌর এলাকার বাউর খুমা, বাউর পাথর, বাশপদুয়া, গুথুমা, সলিয়া, কোলাপাড়া গ্রামসহ মির্জানগর ও চিথলিয়া এবং বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি গ্রামে মাটি কাটার শ্রমিক দিয়ে কৃষি জমির মাটির উর্বর অংশ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে জেলার শহরের ৬টি উপজেলায়ও একই চিত্র দেখা গেছে। এসব ব্রিক ফিল্ডের মধ্যে বেশির ভাগ ব্রিক ফিল্ডই নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সরকার এবং বনবিভাগের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করে এবং কিছু অসাধু সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎকোচ দিয়ে তাদের ব্যবসা দেদারছে চালিয়ে যাচ্ছে। দেখা গেছে, একটি ব্রিক ফিল্ডে কয়লা পোড়ানোর কথা থাকলেও সেখানে পোড়ানো হচ্ছে গাছের লাকড়ি। সরকারী অফিস থেকে কোন পর্যবেক্ষন না থাকার কারণে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোন শোকজ ছাড়া ব্রিক ফিল্ড মালিকদের সাথে কথা বলে মামলার ভয় দেখিয়ে ঘুষ নিজের পকেটে নিয়ে প্রতিষ্ঠানকে না জানিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের সহযোগিতা করছে। জেলা অফিসের হিসাব রক্ষক জানান, রেজিষ্ট্রেশনের বাইরে যারা আছে তাদের নাম জানানো যাবে না। তারা রেজিষ্ট্রেশনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অপরদিকে ফেনী জেলা ইট ভাটা মালিক সমিতির সভাপতির ফোনে অনেকবার ফোন করেও রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া যায়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্রিক ফিল্ড মালিক জানান, আমরা সরকার থেকে অনুমতি নিয়েই ব্রিক ফিল্ড করেছি। পরিবেশের ক্ষতি হলে সরকার আমাদের অনুমতি দিতো না। উপজেলায় নতুন ভাবে স্থাপিত মেসার্স চিথলিয়া ব্রিকস ম্যানফেকচারিং, খন্ডল ব্রিকস ফিল্ড নামের দুটি ইট ভাটার মাটির জোগান দিতে পরশুরামে ব্যাপক ভাবে মাটি বেছা কেনা বেড়ে গেছে। তাছাড়া কোথাও কোথাও এসব মাটি দিয়ে ফসলী জমি ভরাট করে নতুন বাড়ী নির্মানের জন্য উচু করা হচ্ছে। পরশুরাম উপজেলা সদর ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জানান, পৌর এলাকার উত্তর কোলাপাড়া, দক্ষিন কোলাপাড়া, দুবলা চাদ, অনন্তপুর, বাউর পাথর বাউর খুমা সহ সব কটি ওয়ার্ডের কৃষকেরা ফসলি জমির উর্বর মাটি বিক্রি করে দিচ্ছে। মেসার্স চিথলিয়া ব্রিকস ম্যানফেকচারিং এর ব্যাবস্থাপক জানান ইট ভাটার জন্য অনেক মাটির প্রয়োজন তাই তাই বিভিন্ন স্থান থেকে মাটি কিনা হচ্ছে। উপজেলার পুর্বসাহেব নগর গ্রামের কৃষক ওবায়দুল হক জানান তার জমি থেকে প্রতি টাক্টর মাটি সাড়ে তিনশ থেকে চারশ টাকা করে বিক্রি করেছেন। জমির উর্বর অংশ নিয়ে যাওয়ায় উর্বরতা কমে যাবার বিষয় তিনি বলেন টাকার দরকার হওয়ায় মাটি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তবে কয়েকটি স্থানে দেখা গেছে জমির মালিক এর অজান্তে জমির মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। কৃষক দের সাথে বলে জানা গেছে অধিকাংশ জমির মালিক জানে না জমির উর্বর অংশ কেটে নেওয়া হলে জমির উদপাদন ক্ষমতা কমে যায়। উপজেলার কৃষি অফিসের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা জানান প্রতিটি জমির উর্বর অংশের প্রয় দশ ইঞ্চি করে কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এতে জমির ফসল উৎপাদন অর্ধেক কমিয়ে যাবে। গত বছর ধরে ব্যাপক ভাবে মাটি বিক্রির বিষয়টি আশংকা জনক ভাবে বেড়ে গেছে। চিথলিয়া ইউনিয়নের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জানান দুর্গাপুর গ্রামের জসিম উদ্দিন নামের এক কৃষক তার এক একর জমির মাটি বিক্রি করে দিয়েছে , কৃষি কর্মকর্তা জানান ওই কৃষককে জানানো হয়েচে জমির উর্বর অংশ বিক্রি করে দিলে জমির উর্বরতা কমে যায় কিন্তু তার পরও ওই কৃষক মাটি বিক্রি অব্যাহত রাখে। শাহাদাত হোসেন নামের এক মাটি ব্যবসায়ী জানান কৃষকের প্রয়োজনে জমির মাটি বিক্রি করছে। তিনি জানান প্রতি ট্রাক্টর মাটি সাড়ে তিন শ থেকে চার শ টাকা করে ক্রয় করা হচ্ছে। তিনি জানান ইট ভাটায় ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নতুন বাড়ী বানানোর জন্য মাটি বিক্রি করা হ্েচ্ছ। শাহদাত হোসেন জানান কোলাপাড়া পৌরসভা সংলগ্ন স্থানে দেড় লাখ দিয়ে এক প্রবাসীর জমি ভরাটের কাজ চলছে। তিনি জানান তার প্রতিদিন গড়ে ১০/১২ টি টাক্টর ও পাওয়ার ট্রলি দিয়ে মাটি কেটে ইট ভাটায় ও বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান জমির উপরে ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি উর্বর সবচেয়ে উর্বর থাকে। জমির উপরের অংশ বিক্রি করে দেওয়ায় জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে পরবর্তীতে জমিতে যত বেশী সার ব্যাবহার করা হোক না কেন জমির উর্বরতা আগের মত হবেনা। এতে আশানুরুপ ফসল উৎপাদন হবেনা। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরো জানান চারদিকে কৃষি জমির উপরের উর্বর অংশ কেটে বিক্রি করে দেওয়া হচেছ বিষয়টি স্থানীয় কৃষকদের সতর্কও করা হয়েছে।