ফেনীর হ্যান্ডমেইড পেপার মিল এখন দেশের চাহিদা মিঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে

(২১ জানুয়ারী ২০১২) বৈজ্য জাতীয় কাঁচা মাল দিয়ে কাগজ তৈরী করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে ফেনীর শতরূপা ও শুকতারা হ্যান্ডমেইড পেপার মিল। গাছের পাতা, কাঁচা ঘাস, কচুরীপেনা, বৈজ্য পাট, বৈজ্য তুলা ইত্যাদি দিয়ে কাগজ তৈরী করা হচ্ছে এ দু’টি কারখানায়।
ফেনীর চাড়িপুর বিসিক শিল্প নগরীতে এধরনের দু’টি হ্যান্ড মেইড পেপার মিলে উৎপাদিত কাগজ দেশের চাহিদা মিঠানোর পাশাপাশি বিদেশেও রয়েছে প্রচুর চাহিদা এবং সমাদর। এতে বিদেশ থেকে আমদানির পরিবর্তে কাগজ রপ্তানী করে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে,অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও হচ্ছে।
শতরূপা হ্যান্ডমেইড পেপার মিলের সত্বাধীকারী গাজী আবদুর রব জানান,‘ম্যানোনাইট সেন্ট্রাল কমিটি (এমসিসি)’ নামে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর সুবাদে দেশের বাইরে যাওয়ায় বিদেশে হাতে তৈরী কাগজ উৎপাদন হতে দেখে তিনি উৎসাহিত হয়। যার ফলে দেশে এ ধরনের হাতে তৈরী কাগজের কারখানা স্থাপনের চিন্তা করেন। সেই চিন্তা থেকে ১৯৯৪ সালের শুরুর দিকে তিনি প্রথম তার বাসায় হাতে তৈরী কাগজ উৎপানের চেষ্ঠা শুরু করেন।
প্রথমে ম্যানোনাইট সেন্ট্রাল কমিটি বা এমসিসি’র মাধ্যমে ‘শুকতারা’ নামে একটি হ্যান্ড মেইড পেপার মিল প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি ‘শতরূপা হ্যান্ডমেইড পেপার মিল’নামে নিজেও একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। হ্যান্ডমেইড পেপার মিলের জন্য ফেনীর চাড়িপুর বিসিক শিল্প নগরীতে প্লট নেন এবং ধীরে ধীরে ৪৩ শতক জমির ওপর হ্যান্ডমেইড কারখানা স্থাপন করেন। কয়েক বছর পরীক্ষা মূলক উৎপাদন চলে।
বাণিজ্যিক ভাবে উৎপাদনের জন্য ২০০৫ সাল থেকে বিসিক শিল্প নগরীর কারখানার অবকাঠামো নির্মান শুরু করে ২০০৮ সালে শেষ হয়। হ্যান্ডমেইড পেপার তৈরীর প্রক্রিয়া সম্পর্কে কারখানার শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানাযায়, প্রথমে গাছের পাতা (করই পাতা), কাচা ঘাস, কচুরীপেনা, বৈজ্য পাট, বৈজ্য তুলা ইত্যাদি ভাল ভাবে পরিস্কার বা বাছাই করা হয়। তারপর ছোট ছোট আকারে কেটে সাইজ করে পানিতে সিদ্ধ করা হয়। এসময় সামান্য পরিমান ক্যামিকেল দেওয়া হয়। এরপর সেগুলিতে আরো কিছু পানি দিয়ে ধুয়ে মন্ড তৈরী করা হয়। মন্ডগুলকে পরিমান মত পানিতে মিশিয়ে বাঁশের ছাকুনী দিয়ে ছেঁকে তোলার পর সেগুলিকে একটি কাপড়ের ওপর রাখা হয়। এভাবে অনেকগুলো হলে হাইড্রোলিক প্রেস দিয়ে চাপ সৃষ্টি করে পানি নিস্মরন করা হয়। তারপর সেগুলোকে কন্টাক ড্রায়ার দিয়ে শুকানো হয়। অবশ্য শুকানোর সময় কাপড়টা কাগজ থেকে আলাদা করে নেওয়া হয়। তখন অবশ্য কাগজের কোয়ালিটিও চেক করা হয়। যদি কোন ধরনের ময়লা থাকে তা হলে সেগুলোকে পরিস্কার করা হয়ে থাকে। শুকানোর পর কাগজগুলোকে মসৃন করার জন্য দুই শীটের মাঝ খান দিয়ে রোলারের মাধ্যমে ক্যালেন্ডার করা হয়। ক্যালেন্ডার করার পর পেপার কাটিং মেশিন দিয়ে কেটে কাগজের সাইজ বা সিট তৈরী করা হয়। সিট কাটার পর কাগজের বর্ধিত অংশও কিন্তু ফেলা হয়না। সেগুলোকে আবারও রিসাইক্লিনিংয়ের মাধ্যমে কাজে লাগানো হয়। ফলে কোন জিনিষ ফেলতে হয়না। কাগজ কাটার পর কাগজের পুরুত্ব অনুযায়ী বা গ্রাম ভিত্তিক (ওজন অনুপাতে)-গ্রিডিং করে বিক্রি করা হয়।
হ্যান্ড মেইড পেপার বা হাতে তৈরী কাগজ সাধারনত চারুকলা ইনষ্টিটিউটে ছবি আঁকার কাজে এবং দেশের গার্মেন্টস সমুহে ‘টেগ’ হিসাবে ব্যবহার হয়ে থকে। এছাড়া লিখার প্যাড, নোট বই, বিয়ের চিঠি, খাম, রেপিং পেপার (মার্বেল পেপার) হিসাবেও ব্যবহার হয়ে থাকে।
শতরূপা হ্যান্ডমেইড পেপার মিলের সত্বাধীকারী গাজী আবদুর রব জানান, তাদের উৎপাদিত হ্যান্ডমেইড পেপার ঢাকার কিছু প্রতিষ্ঠিত ব্যাবসায়ী কিনে নিয়ে বাজারজাতের করে এবং স্থানীয় চাহিদা মিঠিয়ে তারা বড় একটি অংশ বিদেশেও রপ্তানী করে থাকে।
গার্মেন্টস্ শিল্পের টেগ হিসাবে ব্যবহারের জন্য এবং চারুকলা ইন্ষ্টিটিউটে শিক্ষার্থীদের ছবি আঁকার জন্য বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে এধরনের কাগজ আগে বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো। এখন দেশের চাহিদা মিঠিয়ে উৎপাদিত পণ্যের বড় অংশ বিদেশে রপ্তানী করা হয়। ফলে একদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে, অপর দিকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও হচ্ছে। বছর খানেক আগেও শতরূপা হ্যান্ডমেইড পেপার মিলে শতাধিক শ্রমিক কাজ করলেও বর্তমানে ৬৫ জন শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। এ কারখানায় কর্মচারীদের ৮০ শতাংশই নারী শ্রমিক। একটু ভারী কাজগুলো পুরুষ শ্রমিক দিয়ে করানো হয়। কিন্তু নানা প্রতিকুল পরিস্থিতির কারনে বা সরকারী অনুকুল্যের অভাবে দিনদিন শ্রমিক কমে যাচ্ছে।
সুষ্ঠ ভাবে সরকারী সহযোগীতা পেলে কারখানায় আরো বেশী পণ্য উৎপাদন করা যাবে। এতে একদিকে স্থানীয় কর্মহীন বেকার যুবক ও যুবতীদের যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে তেমনি উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে জানান প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা।